লকডাউনের দিনলিপি

0
181

দুপুরে বাসা থেকে কল আসে। মেয়ে খুব ভালো একটা কাজ করেছে। তার জন্য একটা চিপসের প্যাকেট নিতে অনুরোধ জানানো হয়। মেয়েকে বাইরের খাবার সচরাচর খাওয়ানো হয়না। বিকেলে মনে করে চিপস নিয়ে যাই।

সন্ধে বেলায় মেয়েকে একটা কাজ করানোর ছলে মুখ ফসকে বলে ফেলি- কাজটা করলে বাইরে নিয়ে যাব। গত তিন মাস উনি ঘরে বন্দী হয়ে আছেন। লকডাউনের শুরুর দিকে মাঝে মাঝে ছাদে যেতাম।এরপর থেকে আর বাইরে নিয়ে যাইনা। আগে প্রতিদিনই বাপ-মেয়ে মিলে বাইরে যেতাম। দিনের যে কোনো সময়ে তার বাইরে যেতেই হতো। এখন আর বাইরে যাবার বায়না করেননা। ভেবে পাইনা এটা কিভাবে হলো? প্রকৃতির আলো-বাতাসে বেড়ে উঠা অবুঝ শিশুও বুঝে গেছে ঘরে থাকাই নিরাপদ।

যেই বললাম বাইরে যাব, আমি যে কাজের কথা বলেছিলাম সে কাজ লাটে উঠে। এবার বাইরে যাবার জন্য রীতিমত চিৎকার শুরু করে। বাধ্য হয়ে ছাদের দিকে রওয়ানা হই।

ছয়তলা(আমি বলি সাড়ে পাঁচতলা!) বাসার ৪ তলায় থাকি। পাঁচ তলার একপাশের লোকজন দুইদিন আগে বাড়িতে গেছে। অন্যপাশে সম্ভবত দুই জন থাকেন।বাসার মালিক ছাড়া অন্যদের সাথে আমার তেমন পরিচয় নেই। ছয় তলার অধের্ক বাসা, বাকী অংশে ছাদ। সেখানে একপাশে একজন শিক্ষক থাকেন একা। তিনি থাকেননা জানি। পাশের অংশে একজন থাকেন যিনি কখনো একা আবার পরিবার নিয়ে থাকেন কিছু দিন। আমার ধারণা ছিল উপরের দুই তলায় কেউ থাকেননা। তবে সিড়ি দিয়ে উঠার সময় বুঝেছি ৫ তলায় মানুষ আছেন।

সন্ধে হয়েছে বেশি সময় হয়নি। ছাদের প্রবেশ পথের গ্রিল বৃষ্টির কারণে কেউ বন্ধ করে রেখেছেন কিংবা ছাদে কারোর প্রয়োজন পড়েনা সে কারণেও বন্ধ থাকতে পারে। ছাদে উঠলে মেয়ে সাধারণত ছয়তলার ছাদে থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।৫তলার ছাদ অধের্ক( যেহেতুে এক পাশে বাসা) হওয়ায় আমারো ভালো লাগেনা সেখানে। অনেকদিন পর বাইরে বের হবার কারণে কিংবা কেন যেন মেয়েকে দেখি খানিকটা শান্ত। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার মেঘ ভেদ করে অনেক তারা আকাশে মেলা জমিয়ে বসেছে। মেয়ে বলি-কত তারা আকাশে! মেয়ের কোনো খেয়াল নেই। তিনি কি যেন ভাবেন। আগে ছাদে উঠলে তাকে কোনোভাবেই কন্ট্রোল করা যেত না। লাফালাফি আর হইচই করে সময় কাটাত। মেয়ে কোল থেকে নামেননা।আমি একবার এদিকে যাই, আবার অন্যদিকে।মেয়ের গম্ভির ভাব কাটেনা।

আমি চারপাশে তাকাই।প্রকৃতিকে একটু পরিচ্ছন্ন মনে হয়।নতুন সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয় আমার কাছে। কিন্তু মনে আনন্দ পাইনা।চিন্তা করি আর কতদিন এভাবে কাটবে সময়। প্রার্থনা করি- ‘প্রভু আমাদেরকে নাজাত দাও। আর ভালো লাগেনা এ দূবির্সহ জীবন’।

ছাদের পূর্বদিকের অংশে গিয়ে দাড়াই। কিছু বালু স্তুপ করে ঢেকে রাখা হয়েছে সেখানে। পানি ফিল্টার করার কাজ করা হয়েছে কয়েকদিন আগে। নতুন বালু দিয়ে কাজ করে আগের বালু সেখানে রাখা হয়েছে।বৃষ্টির কারণে হয়তো সেগুলো নামানো হয়নি। আমি একপাশে সরে গিয়ে রেলিং এর কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করি। হঠাৎ রেলিংএ পেছিয়ে থাকা কিছু একটা দেখে একটু সরে আসি। সাপের মত দেখতে জিনিসটা কী বুঝতে একটু সময় লাগে। একটা পুঁইশাকের লতা প্রায় ১৫-১৬ ফুট হবে। একটু টব থেকে এতদূর পর্যন্ত এসেছে সেটি। এই রেলিং এর কাছে কয়েকটি তার টানানো আছে। মাঝে মাঝে আমি সেখানে কাপড় শুকাতে দিতাম। গত কয়েক মাস ছাদে আসা হয়নি। এই সময়ে গাছটি বিনা বাধায় এতদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। বুঝি আমরা ঘরে থাকায় প্রকৃতির অন্য উপাদানগুলো বেশ ভালো আছে।

আগে ছাদে আসলে মেয়েকে নামিয়ে নেয়া কষ্ট হতো। এখন তিনি থাকতে চান নাকি বাসায় যেতে চান বুঝিনা। উনাকে বলি-চলুন বাসায় ফিরি। কিছুই বলেননা তিনি। বেশি সময় থাকতে ভয়ও লাগে। বাসায় চলে আসি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here