মুক্ত বাতাসের প্রতীক্ষায়

0
98

মার্চ্ মাসের মাঝামাঝিতে আতংকিত হয়ে বাইরে যাওয়া শুরু হয়। প্রতিদিনই বাইরে বেরোতে হতো। প্রতিটি মুহূর্ত ভয়ে ভয়ে কাটত। বাসা থেকে বের হতে ইচ্ছে জাগতনা। কিন্তু জীবনের তাগিদে বের হতে হতো। তখন মনের মধ্যে একটি বিষয় কাজ করত সেটি হলো- এক কি দুইটি সপ্তাহ যদি কোনোভাবে কাটিয়ে দেয়া যায় হয়তো শেষ হয়ে যাবে এসব।

২০ তারিখের পরে তিন দিনের ছুটি নিই কর্মস্থল থেকে। ২ দিন পর ছুটি বাতিল। ততদিনে স্বস্থির হয়ে আসে সরকারী প্রজ্ঞাপন। নিয়ন্ত্রিত হয় চলাফেরা।দশ দিনের মত বাসাতেই ছিলাম।আবার অফিসে যাবার প্রয়োজন পড়ে। এবার ভাবনা জাগে রাস্তা দিয়ে যেতে পারবতো!

ভয়ে ভয়ে একদিন অফিসে যাই। রাস্তায় মানুষজন কম। কেউ বাধা দেয়নি। কয়েক ঘন্টা কাজ করে ফেরার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখা মেলে। তারা মানুষজনকে সচেতন করতে ব্যস্ত। অনেকেই বিনা কারণে বের হয়েছে বুঝা যায়।

মার্চ মাসের শুরুর দিকে বাজারে মাস্ক পাওয়া যেতনা।গণমাধ্যমে খবরে জানা যেত মাস্ক পরার দরকার নেই।কিন্তু সেটা আমলে নিতামনা! যেখানে ঔষধের দোকান দেখতাম দৌড়ে যেতাম মাস্কের জন্য। নিরাশ হতে হতো বারবার।মাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন ফুটপাত থেকে দশটা কাপড়ের মাস্ক কিনি।

লকডাউনের পূর্বে রাস্তা দিয়ে আসার সময়ে মাস্ক ব্যবহার করতাম। অফিসের গেইটের কাছে এসে খুলে পকেটে রেখে দিতাম। কয়েক মিনিটের রাস্তা মাস্ক ব্যবহার করতে খুবেই অস্বস্থি লাগত। মনে হতো শ্বাস নিতে পারছিনা।

খবরে দেখি মাস্ক নাকি নর্দমা থেকে কুড়িয়ে এনে বিক্রি করছে কেউ কেউ! আমি আমার গুলো  পরীক্ষা করে দেখি। গেঞ্জির কাপড়ের মাস্কগুলো নতুনই। ব্যবহার করার পর ধুয়ে দিতাম। কয়েকদিন ব্যবহার করতাম। একদিন মাস্ক ব্যবহার করতে গিয়ে দেখি বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। নতুন কয়েকটাকে একসাথে ধুয়ে দিই। ধুয়ার পরে মনে হয় পাতলা হয়ে গেছে! বাজারে তখনো সার্জিক্যাল মাস্ক পাওয়া যায়না।বাসায় দুইটি গেঞ্জি ছিল অব্যবহৃত।সেগুলোকে মাস্কের সমান করে  সেলাই করে লাগিয়ে নিই!এক স্তর দিয়ে শুরু করে দুই থেকে তিন স্তর করে গেঞ্জি লাগানো শুরু করি।

গেঞ্জির কাপড়ের মাস্ক গুলো পরতে ইচ্ছে করতনা। নিজেকে কেমন দরিদ্র মনে হতো। ভাবতাম লোকে ভাবে মাস্ক কেনার টাকা নেই তাই এগুলো পরি! একদিন দুইটি সার্জিকেল মাস্ক কিনে আনি।ততদিনে জেনে গেছি এগুলো একবার ব্যবহার করা যায় মাত্র! এত দামি জিনিস, তাছাড়া বাজারে কিনতেও মেলেনা। মাথায় বুদ্ধি আসে এগুলোর সাথে গেঞ্জির কাপড় জুড়ে দেবার! প্রথমটাতে ১ স্তর পরেরটাতে দুই স্তরের কাপড় লাগিয়ে নিই।

প্রায় ১ মাস মাঝে মাঝে কর্মস্থলে গিয়ে চালিয়ে দিই। এপ্রিলের ২৬ তারিখ থেকে সীমিত পরিসরে অফিসে যাওয়া শুরু করি নিয়মিত।ততদিনে বাজারে সার্জিকেল মাস্ক পর্যাপ্ত আসতে শুরু করে।তবে দাম এক এক দিন এক এক রকম, কোয়ালিটিও ভিন্ন ভিন্ন!

ভয় কিছুটা কাটলেও পুরোপুরি যায়না। সপ্তাহে ৪ দিন বাইরে গিয়ে ৩ দিন বাসায় থাকার চেষ্টা করি।  প্রতিদিনই প্রার্থনা করি- প্রভু  সুস্থ্য রেখো।

লকডাউন খুলে দেবার পর লকডাউনের দিনগুলোতে ভালোই ছিলাম মনে হতো! রাস্তায় মানুষের চলাচল ছিল সীমিত। লকডাউন খোলার প্রথম দিকে মানুষজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে বাইরে আসা শুরু করে! মনে হতো সবাই পতঙ্গের মতো আলোর দিকে ছুটছে।এবার ভয় জাগে লকডাউনের সময়ে যেহেতু আক্রান্ত কমেনি এবার হয়তো বাড়বে। নিজের জন্য দেশের মানুষের জন্য চিন্তা হয়। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও বাসা থকে বের হতে হয়। রাস্তা দিয়ে আসার সময় কেউ মুখের উপর শ্বাস নেয়, কেউ কাশি দেয়, কেউ আবার ধাক্কা দেয়। বুঝি এসবের সাথে অভ্যস্ত হয়েই চলতে হবে। একটা মাস্ক দিয়ে আর ভরসা পাইনা। এবার ‍তিন/চার স্তরের দুইটি মাস্ক পরা শুরু করি।সরাসরি বাতাস যেত নাকে না ঢুকে আটসাট করে মাস্ক বাধি। মাথায় টুপি পরি, চোখে লাগাই চশমা! বাজারের মাস্কের পাশাপাশি নিজে তৈরি করা শুরু করি মাস্ক!

এখনো এভাবেই চলছে জীবন। আল্লাহ ভালোই রেখেছেন। খুবই সতর্ক হয়ে চলি। সারাদিন নাকের উপর দুইটা মাস্ক থাকে।কত সময় পর পর আটসাট করে বাধি। দিন শেষে মুখে দাগ পড়ে যায়। নাক ব্যাথা করে।এভাবে চলছি আর প্রার্থনা করছি- হে প্রভু, তুমিতো মহান। আমরা আর পারছিনা। এবার ক্ষমা করো আমাদের।  মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে দাও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here