বন্যার একাল সেকাল

0
74

আমার শৈশবের দিনগুলোতে প্রতিবছরই বন্যার পানি আসত।বর্ষার প্রথম দিকে যখন নতুন পানি আসত, দল বেঁধে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।পানির সাথে মাছও আসত। বিভিন্ন উপকরণ যোগাড় করতাম মাছ ধরার জন্য। কোনো বছর বন্যার পানি কম  আসত। কোনো কোনো বছর উঠানের কোনা পর্যন্ত আসত। যদি কোনো বছর বন্যার পানি না আসত মন খারাপ হত।কারণ বর্ষাকালটা আমাদের জন্য বেশ আনন্দ নিয়ে আসত।মাছ ধরতে পারতাম, নৌকা নিয়ে ঘুরতে পারতাম, নৌকা করে নানার বাড়ি যাওয়া আসা করতাম। তাই প্রত্যাশা করতাম প্রতিবছর যেন বেশি পানি নিয়ে বর্ষা আসে।

প্রতিবছর বর্ষার পানি আসলেও বন্যা বলতে যা বোঝায় তা আসত অনেক বছর পরপর। ১৯৮৮ সালে বন্যার সময় নানার বাড়িতে ছিলাম। তখন খুব ছোট আমি।নানার বাড়িটা অনেক লম্বা। বাড়ির ভেতরের অংশের উঠানে ২ দিন পানি ছিল সম্ভবত। সামনের বেশিরভাগ অংশে কোনো পানি উঠেনি সেবার।

এরপর বন্যা আসে ১৯৯৮ সালে। সেবার বাড়িতে ছিলাম। আমাদের বাড়ির উঠানে হাটু পানি হয়েছিল। পরেরবার ২০০৪ সালে। সেবার বন্যার পরিধি ছিল ব্যাপক।অনেকের ঘরে পানি উঠেছিল। আমাদের ঘরে পানি উঠেনি।

বন্যায় বেশি পানি হলে খুশির কারণ ছিল কয়েকটা।বানের পানি দেখতে ভালো লাগত। বেশি ভালো লাগার কারণটা হলো পানি বেশি হলে বেশি মাছ আসত। সেখান সেখান থেকে মাছ ধরা যেত। আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন প্রকার জাল ছিল।বর্ষাকালে মাছ ধরার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। সারাদিন পানিতে থাকতে থাকতে পায়ে ঘা হয়ে যেত কিন্তু এসবে তোয়াক্কা করতামনা। ২০০৪ সালের বন্যার সময় হঠাৎ করে আনন্দটা ফিকে হয়ে যায়। চারদিকে কেবল পানি আর পানি।মানুষজন ঘরে মাচা তৈরি করে কোনমতে দিন কাটাতে পারলেও তাদের গৃহপালিত প্রাণি নিয়ে পড়ে সমস্যায়। আশপাশের উচু জায়গা গুলোতে সেগুলো নিয়ে জড়ো হবার চেষ্টা করে। আমাদের ২ টি গরু ছিল।আমাদের গোয়াল ঘর ছিল বাড়ির পেছনের দিকে কিছুটা নিচু জায়গায়। আমাদের রান্না ঘরে কিছু কচুরিপানা দিয়ে একটাকে রাখার ব্যবস্থা করে আরেকটাকে বাড়ির পাশে একটা উচু ব্রিজে নিয়ে রেখেছিলাম।অনেকদিন পানি ঠাঁই দাড়িয়ে ছিল।মানুষজনের কষ্টের অন্ত ছিলনা। আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষজনের ঘরে পানি উঠায় তারা তাদের পরিবারের লোকজন সহ গৃহপালিত পশু-পাখি ‍নিয়ে আশুগঞ্জ সার কারখানার কলোনির চার পাশে আশ্রয় নিয়েছিল।গাদাগাদি করে বাসবাস করতে গিয়ে অনেকে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রন্ত হয়।আমরা কিছুদিন তাদেরকে সেবা দিয়েছিলাম। ডাঃ শাহজাহান নামে এক ভাই ছিলেন যার সাথে লেখালেখির সুত্র ধরে পরিচয়। তিনি বিনামূলে সকল ঔষধ সরবরাহ দিয়েছিলেন। সেবার বন্যার পানিতে মানুষের দূর্ভোগ দেখে প্রার্থনা করেছিলাম। প্রভু এতবড় বন্যা আমাদের দেশে দিওনা।(অসমাপ্ত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here