খৈয়াছড়া ঝর্ণা ভ্রমণ

0
183

সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ট্রেন লেট হবে জেনে নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টা পরে স্টেশনে পৌছে শুনি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে,  তবে রাতের ট্রেন ঠিক সিডিউলে ছেড়ে যাবে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে টিকেট বদলিয়ে  রাতের ট্রেনের টিকেট নেবার জন্য । আমার সঙ্গীকে(যিনি কসবা যাবেন তাই যে কোনো ট্রেনে যেতে পারবেন) স্টেশনে বসিয়ে রেখে কাউন্টার থেকে টিকেট চেঞ্জ করে  বাসার দিকে রওয়ানা দিই।

রিক্সা চলে কাজির দেউরির দিকে। আমি ভাবি দিনটা কাটাব কিভাবে? সপ্তাহ খানেক আগে প্লান করে রেখেছিলাম বৃহস্পতিবার বিকেলে রাঙামাটি গিয়ে শুক্রবার সারাদির ঘুরাঘুরি করে রাতে সিলেট ফিরব।  হঠাৎ বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সিলেটর টিকেট না নিয়ে কিশোরগঞ্জের টিকেট কিনেছিলাম। বাড়ি যাবার সিডিউল চেঞ্জ হওয়ায় গত রাতে সে টিকিট চেঞ্জ করে সিলেটের টিকিট নিয়েছিলাম। এমন হবে জানলে রাঙামাটি থেকে ঘুরে আসতাম। কিছুই হয়নি ভেবে মন খারাপ হয়ে যায়।

বাসায় ফিরে ব্যাগ রেখে বাইরে বেরিয়ে আসি। পুরো দিন যেহেতু আছে দূরে কোথাও যাওয়া যেতে পারে। তবে কি রাঙামাটি যাব?  দিনে দিনে যদি ফিরতে না পারি? দেশের পরস্থিতি ভালোনা।  পরে আবার কোন ঝামেলায় পড়ে যাই  চিন্তায় রাঙামাটি যাবার কথা বাদ দিই।

খৈয়াছড়া ঝর্ণার  নাম শুনেছিলাম। নেটে ঘেটে কিছু তথ্যও সংগ্রহ করেছিলাম। সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। জায়গাটা ফেনীর কাছাকাছি। দশটার বেশি বাজে। সন্ধের মধ্যে ফিরতে পারব কিনা সংশয় জাগে মনে।  আবার ভাবি সাথে ব্যাগ নিয়ে যাই। যদি দেরি হবার সম্ভবাবনা থাকে ফেনী চলে গেলেই হবে। সেখান থেকে ট্রেনের ওঠা যাবে।

চট্টগ্রামে আসার সময় ব্যাগ ছিল একটা।  গত বিশ দিনে ব্যাগ আরেকটা বেড়েছে। ঘুরে ঘুরে বেশ কিছু জিনিসপত্র কেনা হয়েছে।  এ দুই ব্যাগ নিয়ে কিছুতেই বেড়াতে যাওয়া যাবেনা।

 কপালে যা আছে তাই হবে মেনে নিয়ে রিক্সায় উঠি কদমতলীল উদ্দেশ্যে।

ফেনীর যাবার বাসে উঠি। কন্ট্রাক্টরকে বলি যেন বড়তাকিয়া বাজারে নামিয়ে দেয়।  চলতি পথে আরো কয়েকবার তাকে বলি কথাটি।   কিন্তু সে আমাকে নামিয়ে দেয় মিরসরাই! নামার সময় জানতে চাই এমনটি করার কারণ?  দুঃখ প্রকাশ করে বলে -`মনে ছিলনা’!

আবার উল্টা পথে রওয়ানা হই। বড়তাকিয়া বাজারে আসি। বাজারের পাশেই একটা মাজার। লেখা আছে তিনি বার আউলিয়ার সর্দার।  মাজারে তেমন চাকচিক্য নেই।  পাশের ছোট একটা মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ে নিই। মসজিদে স্থান সংকুলান হয়নি। অনেক মানুষ বাইরে দাড়িয়ে নামজ পড়েছে।

নামাজ শেষে কিছু খাবার জন্য আবার বাজারে যাই। ভালো মানের কোন খাবারের দোকান নেই। বরবটির বিচির সমান এক একটা সাইজের এক প্লেট ভাত দিয়ে খাবার সেরে নিই।

একটা সিএনজি ভাড়া করে খৈয়াছড়ার পথ ধরি।  কৌশলে শুধু ভাড়াই বেশি নেয়নি সিএনজিওয়ালা সেখানে নিয়ে নামিয়ে দিয়ে ভুল পথ দেখিয়ে আমাকে সামনে আগাতে বলে।

  একটা পার্কের ভেতর দিয়ে, জন মানবহীন এক পাহাড়ের উপর দিয়ে সামনে আগাতে থাকি। মন বলছিল এটা ভুল রাস্তা!

পাহাড়ের উপর উঠে কিছু সময় দাড়িয়ে থেকে রাস্তা খুঁজি। রাস্তা পাইনা। এক দিকে একটি বাড়ির সামনে কিছু মাহিলা দেখে সেদিকে নামতে আরম্ভ করি। চলার মত পথ নেই ; এদিক সেদিক দিয়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কষ্টে নামি। তত সময়ে নারীরা সব মিলিয়ে গেছে বনের ভেতরে। সামনে আগাই ।  ছড়া থেকে পানি নিয়ে ফিরছে এক নারীর কাছে ঝর্ণার রাস্তা কোন দিকে জানতে চাই। তিনি ঝিরি ধরে সামনে যেতে বলেন।

ছড়া ধরে চলতে থাকি।  একটা জমি থেকে পাকা টমেটো তুলছে কয়জন কৃষক। তাদের কাছে জেনে নিই সঠিক পথে যাচ্ছি কিনা। তারা বিপরীত পাড় দিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। ছড়া পার হতে গিয়ে জুতা খুলতে হয়। জুতা জোড়া হাতে নিয়ে হাঁটি।

সামনে পিছে ডানে বায়ে  সবখানেই বন।  নিস্তব্দ পরিবেশ। মানুষ কেবল আমি একা। দ্রুত পা চালাই।

রাস্তা ঘেষে একটি ঘর। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সেদিকে তাকিয়ে দেখি ঘরের এক অংশে  দোকান। একজন মুরব্বী জাল বুনছে। ঘরের ভেতরে গিয়ে  চৌকির নিচে জুতাগুলো রাখি।

এবার বেশ হালকা লাগে নিজেকে। দ্রুত পা বাড়াই। কয়েশ গজ সামনে যেতেই  দেখি একটি পিকনিক পার্টি। তাদের খাইদাই পর্ব চলছে। মন আনন্দে নেচে উঠে। হয়তো পাশেই ঝরণা! 

তাদেরকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই। রাস্তা ফুরায় না কিংবা ঝরণার দেখা মেলেনা। উচু নিচু  পথ পেরিয়ে  – ছড়ার মাঝ খান দিয়ে পথ চলতেই থাকি।

নির্জনতা বাড়ে। এবার মনে ভয় জাগে। কোথায় যাচ্ছি আমি ? কোন বিপদে পড়লে উদ্ধার করার মত কেউ এগিয়ে আসেবনা। এমন নিস্তব্দ জঙ্গল দিয়ে  সামনে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে? মনে নানান দুশ্চিন্তা আসলেও পা থামেনা। ভাবি সেই সকাল থেকে রওয়ানা হয়ে এত দূর এসেছি আর এখান থেকে ঝরণা না দেখেই ফেরত যাব? কিভাবে হয়! একটা শক্ত লাঠির  অবাব বোধ করি।  কোন বন্য প্রাণীর ভয় মনে জাগেনা। ভয় হয় যদি কোন দু ’পায়া প্রাণীর আক্রমণের শিকার হই!

অনেকটা পথ চলার পর হঠাৎ মানুষের কণ্ঠের আওয়াজ পাই। কতটা খুশি হই তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। এক প্রকার দৌড়াতে শুরু করি। খানিক বাদেই ঝর্ণার দেখা পাই।

ঝর্ণার পাদদেশে সাকুল্যে ৬জন যুবক। দুইজন পানিতে ধাপা ধাপি করেছে । একজন পাও ভেজায়নি জলে। তিনি ছবি তুলছেন।  অপর তিনজন  ভেজা কাপড়ে দাড়িয়ে পানিতে থাকা ২ জনকে উঠার জন্য ডাকছে। তাদের যাবার তাড়া আছে।   অদূরে চকলেট ,চিপস নিয়ে ছোট দোকান সাজিয়ে বসে আছে এক দোকানী।

পানি প্রবাহ তেমন নেই। আমি দাড়িয়ে ঝরণা দেখি। ফাঁকে একজনকে দিয়ে ঝরণার সাথে আমার একটা ছবি উঠিয়ে নিই।

বামদিকের এক পাশে  উপর থেকে দড়ি ধরে ধরে কয়েকজন নিচে নামছে দেখে তাদের কাছে যাই। জানতে চাই তারা কোথা থেকে নামছে।  তারা জানায় উপর থেকে নামছে। ইচ্ছে করলে আমি উপরে যেতে পারি। নেট ঘাটাঘাটি করে জেনেছি এটি আট ধাপের ঝরণা। আমি ধড়ি ধরে উপরের দিকে উঠতে শুরু করি।

রোদের প্রচন্ড তাপে মাটি গরম হয়ে আছে। জুতা ছাড়া হাঁটার অভ্যাস নেই অনেক দিন ধরে।  পায়ে খুব তাপ লাগে। চলার পথ ও মসৃন নয়।  কখনো  পা পিছলে যায়! যে কয়হাত দড়ি ছিল বেশ স্বাচ্ছন্দে উঠেছিলা।  গাছের শিকড় ধরে আবার কখনো গাছের ডাল ধরে উপরের দিকে উঠি।

কতসময় উঠার পর গোলক ধাধায় পড়ি। কয়েকটা রাস্তা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। কোনটি উপরে আবার কোনটি নিচের দিকে।  অনুমান করে সামনে এগিয়ে নিচের  দিকে নামি। তৃতীয় ধাপের ঝর্ণার দেখা পাই।

বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ি। ছোট একটা পানির বোতল সাথে নিয়ে এসেছিলাম । গলা ভিজিয়ে নিই। এখান থেকে ঝর্ণার চতুর্থ ধাপটা ও দেখা যায়া মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি।  ইচ্ছে জাগে আরো উপরে উঠার। রাস্তা কোনদিকে ভেবে পাইনা।

হঠাৎ উপরের দিকে মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাই।  আমি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি

উপরে কেউ আছেন?

জবাব আসেনা।

আবার গলার স্বর শুনতে পেয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে জানতে চাই- কেউ আছেন নাকি উপরে? এবার জবাব আসে। আমরা আছি!

আমি উপরে আসব; রাস্তা কোনদিকে?

ঝর্ণা দিয়ে সামনে চলে আসুন।

ঝর্ণার ভেতর তো জঙ্গল! আসব কিভাবে?

গাছের ফাক দিয়ে চলে আসুন। রাস্তা আছে।

আমি সামনে পা বাড়াই।  ছোট্ট এক সরু রাস্তা দিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি  আমার বয়সী  দুইটি ছেলে ডালপালা ধরে ধরে নিচে নামছে। আমি উপরে উঠার চেষ্টা করি।

অস্বাভাবিক খাড়া এ পাহাড়। ভয় জাগে যদি না উঠতে না পারি কিংবা পা পিছলে পড়ে  যাই যদি! নামবইবা কিভাবে? আবার ভাবি তারা যেহেতু উঠতে পেরেছে আমি পারবনা কেন? আমারতো পাহাড়ী রাস্তায় চলার অভিজ্ঞতা আছে।  সরু গাছের  ডাল এবং শিকড়  ধরে উঠতে শুরু করি।

তারা দুইজন উপর থেকে নামছে।  আমরা পরস্পর মিলিত হই। জানতে চাই তারা কোন পর্যন্ত গিয়েছিলেন?

জবাবে জানান উৎপত্তিস্খলে গিয়েছিলেন। খুবই সুন্দর জায়গা। তবে উঠা খুবই রিস্কি।

আমি উপরের দিকে উঠার চিন্তা করি। তারা মানা করেন। সামনে কেউ নেই। তাই একা যাওয়া ঠিকনা।

আমি থেমে যাই। ফেরারও তাড়া আছে। যদি দেরি হয়ে যায়। তিনজন দাড়িয়ে থাকি।

একজনার মাথায় আচমকা ভুত চাপে।  তৃতীয় ধাপের ঝর্ণার দিকে খুবই বিপদসংকুল এক পথ দিয়ে আগানো শুর করে। তাকে বার বার বারণ করি। তিনি শুনেননা। এগিয়ে যান জীবনের ঝুকি নিয়ে। ভেছিলাম তিনি যেতে পারবেননা। রাস্তাটা কেবল এক পায়ের। পা ফেলায় একটু হেরফের হলেই জীবন বিপন্ন । তিনি হন হন করে চলে যান! আমরাও সে দিকে পা বাড়াই।

তৃতীয় ঝর্ণার পাদ দেশ পর্যন্ত যাই। খুবই পিচ্ছিল পথ। একবার পা পিছলে পড়ে গেলে হাড়গোড়তো ভাঙ্গবেই , কোথায় গিয়ে পড়তে হবে সেটাও বোঝা যায়না।  কাক ভেজা হতে হতে কিছু ছবি তুলে নিই।

প্রথম ধাপের উপরের দিকে নেমে আসি। অনেকটা হাপিয়ে উঠি আমরা। কিছু সময় জিরিয়ে নিই। তারা দুই লিটারের একটা পানির বোতল সাথে নিয়ে উঠেছিলেন। কিভাবে এ ভার  বয়ে নিয়ে উঠেছিলেন তা বোধগম্য হয়না। নামার সময়ে তারা আর হাতে নিয়ে নামেননি। সেটাকে  ছেড়ে দেন । গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে।  যেখানে আটকে যায় আবার সেখান থেকে তুলে  আবার গড়ানোর জন্য ছেড়ে দেন।  একবার আমি সেটা তুলে ছেড়ে দেই।  গড়ানোর এক পর্যায়ে ছিপি খুলে গিয়ে সব পানি পড়ে বোতল খালি হয়ে যায়। আমি তাদেরকে আমার অর্ধেক পানির বোতলটা দিয়ে দেই! অবশ্য একটু পানি পান করে সেটা ফেরত দিয়ে দেন।

আমরা ঝর্ণার নিচের ধাপে অর্থাৎ নিচের দিকে  চলে আসি। তিনি আবার অমসৃণ পাথর বেয়ে ঝর্ণারপাদদেশে চলে যান। আমি তার কয়েকটাছবি তুলি । আমারো ইচ্ছে জাগে তার কাছে যাবার। কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। কিছুতেই  সঠিক জায়গায় পা ফেলতে পারিনা। এখান থেকে পিছলে পড়লে জীবন বিপন্ন হবার আশংকা নেই। তবে পানিতে হাবুডুবু খেতে হবে। কিভাবে সেখানে গেছেন তা  জানতে চাই। তিনি নেমে এসে আবার সেখানে যান। তৃতীয়বারের চেষ্টায় আমি সফল হই।  ঝর্ণার পানিতে ভিজে ভিজে কয়েকটা ছবি তুলি। অনেক কষ্টে সেখান থেকে নিরাপদে নেমে আসি।

বেলা ডুবার বেশি সময় বাকী নেই। আমরা  ফিরতি পথে রওয়ানা দেই। পথে একটা বরই গাছ পাই যেটিতে পাকা কুল ঝুলছে।  আবারো সেই … লাফ দিয়ে গাছে উঠে প্রচন্ড জোরে  ঝাকুনী শুরু করে। অমি বারবার সতর্ক করি মালিক যদি যদি কিছু বলে।তিনি জবাব দেন রাস্তার পাশেরে লাগানে গাছে পথিকের হক আছে!  অনেক গুলো বরই কুড়িয়ে পকেট ভর্তি করে নিই। টিস্যুতে মুছে সেগুলো  খেতে শুরু করি।

সেখানে সিএনজিওয়ালা নামিয়ে দিয়েছিল সেখানে এসে দেখি একটা সিএনজিও নেই।

বরই খেতে খেতে আমরা হাঁটতে থাকি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here