ঈদ সেলামী ও বাবাদের গল্প

0
115

ঈদে আমি নিজের জন্য কেনাকাটা করিনা। ঈদের কাপড় বাবা কিনে দেন।বিষয়টি আমার সহকর্মীরা জানেন। এ নিয়ে প্রতি ঈদেই নানা কথা বার্তা হয়। কেউ কেউ আড় চোখে দেখেন। তেছড়া মন্তব্য ও করেন কেউ। ‘বাবার কাছ থেকে নেন কেন’ সহ নানা কথা শুনি। উত্তরে বলি আমার পরিধেয় বেশিরভাগ কাপড়ই বাবা কিনে দেন; ঈদের কাপড় কিনে দিলে সমস্যা কি? তবে মূল কারণ হল বেশ আনন্দ পাই বাবার দেয়া জিনিস গুলোতে যা আমি বর্ণণা করতে পারিনা।মনটা আনন্দে ভরে উঠে।

ছোট বেলার কথা তেমন মনে নেই। কখনো ঈদ করতাম নানা বাড়ি কখনোবা আমাদের বাড়িতে। ঈদে চাওয়া পাওয়া তেমন ছিলনা। একটা শার্ট, একটা প্যান্ট আর ঈদের দিনে কিছু টাকা। আগে থেকেই কিছু টাকা জমিয়ে রাখতাম ঈদের জন্য। সকালে বাবার সাথে ঈদগাহে যেতাম। নামাজ শেষে বাবা বিভিন্ন খেলনা কিনে দিতেন। আর টাকা যা দিতেন তা দিয়ে ইচ্ছেমত জিসিন কিনতাম এবং খেয়ে নিতাম।

আমি জীবনে কাউকে সালাম করে টাকা নিইনি বা এমন কেউ ছিলওনা। কেবল ঈদের দিন সকালে বাবা টাকা দিতেন। কখনো যা দিতেন তার সাথে আরো কিছু চেয়ে নিতাম।টাকার অংকটা ছিল পাঁচ – দশ টাকায় সীমাবদ্ধ। এখন আর কেউ ঈদের সেলামি দেয়না! আফসোস কেন যে বড় হলাম!

সেলামি পাওয়ার বয়স পেরিয়ে দেবার বয়স এসে গেল কখন টের পাইনি। পাঁচ টাকার যুগও শেষ হয়ে গেছে! এবার সেলামি দিয়েছি র্সবনিন্ম একশ টাকা করে। মাকে দিয়েছি সর্বোচচ পাঁচশ টাকা।বলে রাখি সেলামি দিতে গিয়ে আমি ফতুর!

সেলামি দেয়া শুরু করেছিলাম ঈদের তিন দিন আগ থেকে। ঈদের দিন নামাজে যাবার আগে একে একে সেলামি দিয়ে যাচ্চি। এস সময় দেখি আমার বড় কাকা( বাড়ি ছেড়ে একটা দূরে গিয়ে নতুন বাড়ি করেছেন) ছোট কাকার ঘর থেকে বের হচ্ছেন। প্রথম বারের মত কাকার সামনে গিয়ে ঈদ সেলামি দিতে চাইলাম। অনেক সাধলাম উনি নেননি।আমি উনাকে ধরে নিয়ে আসি আমাদের ঘরের কাছে। ফের জোর করি; পকেটে গুজেঁ দেয়ার চেষ্টা করি। কসরত করতে গিয়ে নতুন নোটটা নাজেহাল হল কিন্তু কিছুতেই দিতে পারিনি।

নামাজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়। দেখি কাকা ঘরে বসে আছেন। উনি মায়ের কাছে সবিস্তারে বলেছেন সে কাহিনী। মা জানতে চান শখ করে যখন দিয়েছে নেননি কেন? মাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন ‘ছেলের কাছ থেকে টাকা নেয়া যায়’? এখানে বলে নেয়া ভাল কাকা চাকুরী করেন।

বাবাকে টাকা দিতে ইচ্ছেই করেনি। কেন করেনি তা বলি। বাড়ি থেকে ফেরার পথে প্রায়ই আমার গাড়ি ভাড়া থাকেনা। তাই বাবার কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ফিরতে হয়। মাস দুই আগে এক সকালে ঢাকায় যাবার সময়ে বোন বলে ‘বাবার শার্ট গুলো পুরোনো হয়ে গেছে; কয়েকটা নিয়ে এসো’। আমার পরিকল্পনা ছিল ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেটে ফিরব তাই পাঁচশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে বলি ‘একটা শার্ট কিনে নিয়েন’। আমার কথায় বাবা কেমন হা করে তাকিয়ে থাকেন। বিষয়টি উনার কাছে অবাকই ঠেকে। উনি টাকা নেননা। ওই দিকে আমার সময় যাচ্ছে। ফের বলি টাকাটা নেন। তাতেও বাবার কোন বোধদয় নেই। কাচুমাচু করে বলেন ‘না না সেদিন শার্ট বানালাম নতুনই আছে’। আমি ফের বলি নেন টাকাটা । জবাব দেন ‘তুমি নিয়ে এসো’। মা বসা ছিলেন পাশে তিনি বলেন ‘ছেলে দিয়েছে নিয়ে নেন’। মায়ের কথায় আমতা আমতা করতে করতে টাকাটা হাতে নেন। এক মাস পরে জানা গেল সেই টাকা দিয়ে শার্ট কিনেননি তিনি। গ্যাস বিল দিয়েছেন!

আরেকটা ঘটনা বলে শেষ করছি।বছরের শুরুর দিকে একমাস গাজীপুরে ছিলাম। সারা দেশ থেকে ২১ জন গিয়েছিলাম আমরা।এক রুমে থাকার সুবাদে যশোরের একজনার সাথে বেশ ঘনিষ্ট হয়ে উঠি। উনার ছেলের বয়সী তাই নিজের ছেলের মত আদর করতেন; নানা উপদেশ দিতেন। সাথে মোবাইল ছিলনা বলে আমার নম্বরটা বিভিন্ন জায়গায় দিয়ে রাখতেন।কদাচিত আমার মোবাইল দিয়ে ফোন করতেন। বাইরের দোকান থেকেই ফোন করতেন বেশি। বিষয়টি বুঝতে খুব রাগ করতাম। উনি বলতেন আপনার টাকা নষ্ট করার কি দরকার। প্রতি উত্তরে বলতাম আপনি বাইরে থেকে যে টাকায় কথা বলেন আমার মোবইল দিয়ে কথা বললে তার অর্ধেক টাকা খরচ হয়। এত টাকার অপচয় হয়। অনেক বোঝানোর পর রাজী হয় ।

মাঝে মাঝে বাইরে গেলে অনেক চেষ্টা করতেন এটা সেটা খাওয়ানোর জন্য। কোনদিন গাড়ি ভাড়াটা দেয়ার কসরত করতেন। আমি আগ বাড়িয়ে দিয়ে দিতাম। মন খারাপ করতেন প্রায়ই।কখনো রেগে বলতেন আর যাবনা আপনার সাথে। আমি জোর করে নিয়ে যেতাম। যাবার বেলায় শর্ত দিতেন। আমি তা মানলেতো!

যেদিন ফিরে আসব সেদিনের ঘটনা। ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে উঠি দুইজন। উনার এক ভাই থাকনে টঙ্গিতে। তার বাসায় রাত্রি যাপন করে পরদিন যশোরে রওয়ানা দিবেন পরিকল্পনা করেন। সেদিন তিনি শুধু বাস ভাড়া দিয়েই ক্ষান্ত হননি নামার সময় আচমকা আমার পকেটে একটা একশ টাকার নোট গুঁজে দেন। হাতে দিলে নিবনা জানতেই তাই এমনটি করেছেন।আমি থ বনে যাই। কেউ এভাবে আমাকে টাকা দিতে পারে ভাবনারও অতীত ছিল। তাঁর মধ্যে সেদিন শুধু একজন বাবার ছায়াই দেখিনি তার স্নেহের পরশে চোঁখ বেয়ে দু ফোটা অশ্রুও গড়িয়ে পড়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here